শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৯:০২ পিএম, ২০২৬-০৮-০৪
ক্ষমতার আলো যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি তার ছায়াও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদল শুধু শাসকের ভাগ্য বদলায় না; বদলে দেয় ক্ষমতার বলয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের অবস্থানও। যারা একদিন রাষ্ট্রের আনুকূল্যে সম্মান, প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর তাদের অনেকেই হয়ে পড়েন বিতর্কিত, একঘরে কিংবা অগ্রহণযোগ্য। অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই চিরচেনা বাস্তবতারই আরেকটি প্রতিফলন। এটি শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সংকটের কাহিনি নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্যোতিকা জ্যোতি দাবি করেছেন, সরকার পরিবর্তনের পর তিনি একের পর এক পেশাগত ও ব্যক্তিগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। চাকরি হারানো, চলচ্চিত্র থেকে বাদ পড়া, সাংস্কৃতিক আয়োজনে দায়িত্ব না পাওয়া, এমনকি বাসা ছাড়ার মতো পরিস্থিতির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এসব দাবির সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। তবে তার বক্তব্যের বাইরেও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাজনৈতিক পরিচয় কি একজন শিল্পীর পেশাগত ও সামাজিক ভবিষ্যতের নিয়ামক হয়ে উঠবে?
জ্যোতিকা জ্যোতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, তিনি শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকার পরিবর্তনের পর সেই পদ হারাতে হয় তাকে। একই সঙ্গে ‘আলো আসবেই’ নামের একটি বিতর্কিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তার সক্রিয়তার অভিযোগও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রুপটি তৎকালীন সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং আন্দোলনবিরোধী প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই এখনো বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। তবে জনপরিসরে তার ভাবমূর্তি গঠনে এসব বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সময় বহু প্রাণহানি, দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। একই সঙ্গে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকাও জনসমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কেউ আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কেউ নীরব থেকেছেন, আবার কেউ ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে—এটাই স্বাভাবিক।
তবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, জনসমালোচনা আর বিচার এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, তবে তার বিচার হবে আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক বর্জন, পেশাগত অবরোধ কিংবা ব্যক্তিগত নিপীড়ন যদি শাস্তির বিকল্প হয়ে ওঠে, তবে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবার এটিও সত্য, কোনো শিল্পীকে গ্রহণ বা বর্জন করার অধিকার দর্শক ও সমাজের রয়েছে। তাই আইনের শাসন, জনমত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই ঘটনাটি শিল্পীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। শিল্পীর শক্তি কখনোই রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়; তার শক্তি মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং স্বাধীন বিবেকে। রাষ্ট্রক্ষমতার অতিরিক্ত সান্নিধ্য শিল্পীর স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ক্ষমতার ছায়ায় অর্জিত মর্যাদা ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে অর্জিত সম্মান সহজে হারায় না। তাই শিল্পীর প্রথম দায়িত্ব ক্ষমতার নয়, সত্য ও সমাজের প্রতি।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দীর্ঘদিনের একটি অসুস্থ বাস্তবতাও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, নিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সুবিধাভোগীদের নাম; কিন্তু সংস্কৃতির রাজনৈতিককরণের প্রবণতা থেকে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিল্প, দুর্বল হয় প্রতিষ্ঠান এবং সংকুচিত হয় মুক্তচিন্তার পরিসর।
গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত করতে হলে বিচার হতে হবে তথ্য, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে; প্রতিশোধ কিংবা আবেগের ভিত্তিতে নয়। একই সঙ্গে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদেরও উপলব্ধি করতে হবে, ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য সাময়িক সুবিধা এনে দিলেও শেষ পর্যন্ত তা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষয় করে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী। তাই একটি সরকারের পতনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। জ্যোতিকা জ্যোতির ঘটনাকে তাই কেবল একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগ বা রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে হাঁটছি, নাকি কেবল পুরোনো সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ তৈরি করছি? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তবে ক্ষমতা বদলালেও রাষ্ট্র বদলাবে না। আর যদি উত্তর প্রথমটি হয়, তবে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, শিল্পের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন—এই চারটি স্তম্ভের ওপরই নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে।
লেখক : রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কোনো শিরোনামে ধরা পড়ে না, কোনো আলোচনায় দীর্ঘ হয় না; তবুও তাঁদের নীরব উপ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। ব...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতরে মানুষ খুঁজে পায় সাময়িক প্রশান্তি, কেউ খুঁজে পায় অভ্যাস, আর কেউ ক্লান্ত জীবনে...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ঈদের সকাল গড়িয়ে দুপুর নামতেই দেশের অলিগলি, গ্রামের উঠোন আর শহরের মোড়ে মোড়ে জমতে থাকে কোরবানির পশুর...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী জাতির সামনে আবারও স্মরণ করিয়ে দি...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়—এটি একটি সমাজের বিবেকের পরীক্ষা। যখন কোনো শ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited